নওগাঁ ০৩:৫৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
পরীক্ষামূলক সম্প্রচার :
মহাদেবপুর দর্পণ.কম ও সাপ্তাহিক মহাদেবপুর দর্পণের পরীক্সষমূলক সম্প্রচারে আপনাকে স্বাগতম ## আপামর মেহনতি মানুষের অকুন্ঠ ভালোবাসায় সিক্ত নওগাঁর নিজস্ব পত্রিকা ## নওগাঁর ১১ উপজেলার সব খবর সবার আগে ## মহাদেবপুর দর্পণ একবার পড়ুন, ভালো না লাগলে আর পড়বেন না ## যেখানে অনিয়ম সেখানেই মহাদেবপুর দর্পণ ## যেখানে দূর্নীতি, অন্যায়, অবিচার সেখানেই মহাদেবপুর দর্পণ সব সময় সাধারণ মানুষের পাশে ## মহাদেবপুর দর্পণের ফেসবুক আইডিতে ফলো দিয়ে সঙ্গেই থাকি ##

সম্পাদকীয় : মংলু পাগল নয় : অসৎ সমাজপতিদের প্রতি ঘৃনায় পাগল সেজে থাকতো<<মহাদেবপুর দর্পণ>>

মহাদেবপুর দর্পণ : এমন একটা জলজান্ত সুস্থ্য সবল সজ্ঞানে থাকা মানুষকে ওরা পাগল কেন বলতো? কেন তার নামের সাথে পাগলা জুড়ে দিতো? ও কি কোনদিন কখনো কোনরকম পাগলামো করেছে? একটি বার? কাউকে কি কখনো কামড়েছে? মারপিট, ইট ফিকে মারা, অথবা অকথ্য ভাষায় গালাগাল? আপন মনে কখনো কেউ তাকে পাগলের মত বিরবির করতে শুনেছে? তাহলে কোন বৈশিষ্টের কারণে আমাদের আধুনিক সমাজের সম্মানী মানুষেরা কেন পাগল বলে আখ্যায়িত করতো? এইযে একটা মানুষকে সারাজীবন সমাজ অসম্মান করে গেলো, একটা মানুষকে ভাবতে বাধ্য করা হলো যে সমাজ তাকে ছোট ভাবে, ঘৃনা করে এর দায় কার?

মংলুর বয়স হয়েছিল। প্রায়ই অসুস্থ্য থাকতো। তার পোশাক আশাক নোংড়া থাকতো। এর মেলা কারণ আছে। সমাজকে সে প্রচন্ডরকম ঘৃনা করতো। এই সমাজে তার যে একটা অবস্থান আছে এটা সে কখনো ভাবতে পারেনি। সমাজপতিরা তাকে সেটা ভাবার কোন সুযোগ দেয়নি। একজন চেয়ারম্যানের সম্পর্কে সে প্রায়ই খারাপ কথা বলতো। আরো অনেকের দূর্নীতির কথা বলতো। অন্য কাউকে না। দেখা হলে সরাসরি যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকেই বলতো, ‘এই অমুক! তোর এই কাজের তো ব্যবস্থা হচ্ছে রে। আর কতদিন খাবু’।

মহাদেবপুর দর্পণে একবার মংলুর ইন্টারভিউ লাইভ করেছিলাম। দুপুর গড়িয়ে গেছে, খাওয়া হয়নি তখনো। প্রচন্ড ক্ষুধার্ত। কথা বলতে চাচ্ছিলনা। খাওয়ালাম। তারপর শুরু করলাম। জীবনের শেষ বয়সেও কেউ তাকে কোন ভাতার কার্ড করে দেয়নি। সেতো প্রতিবন্ধী ভাতা পাবার হকদার ছিল। এই ভাতা তো একশ ভাগ দেয়া হয়। তাহলে শুধু তার ফরম পূরণ করে দিলেই সে ভাতা পেতো। এই কাজটি গত চার পাঁচ টার্মের কোন চেয়ারম্যান করে দেননি। না বয়স্ক ভাতা, না দশ টাকার চাল, না কোন মওসুমে দশ কেজি, বিশ কেজি চাল, না কোন চিকিৎসা ভাতা, না কোন গরু ছাগল, ভেড়া, মুরগি। কেনো?

লাইভ প্রচারের পরও কেউ এগিয়ে আসেননি তাকে সাহায্য করতে। না প্রশাসন, না জনপ্রতিনিধি, না কোন এনজিও বা ব্যক্তি কেউ। তদানিন্তন চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তিনি তখন বলেছিলেন আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কার্ড করে দিবেন। কিন্তু না।

লাইভ দেখানোর পর থেকে মংলুর সাথে একটু খাতির হয়। দেখা হলে জানতে চাইতাম খাওয়া হয়েছে কিনা। দশ বিশ টাকা দিলেই খুব খুশি হতো। কিন্তু কি আশ্চয্য, অন্য কেউ তাকে টাকা দিতে চাইলেও নেয়না। কোনদিন কারো কাছে সে ভিক্ষেও চায়নি। তার পছন্দের কেউ যদি তাকে কিছু দেয় তবেই সে নিত। একদিন টাকা নেই। বললাম বাসায় চল খাবি। : কি দিয়ে ভাত? : মুরগির মাংশ। : খামু। এরপর যখন বলতাম বাড়ি যা খেয়ে আয়। সে আসতো। আমার বাড়িওয়ালীকে বলতো গিরস্ত পাঠায়ে দিল। ভাল তরকারি হলে খায়। আগে জিজ্ঞাসা করে নেয়। আমার স্ত্রী একদিন আমাকে বললো, আজ মংলু একটা আজব কান্ড করেছে। : কি? মাংশ ভাত হাতে নিয়ে সে কাকে যেন খুব গাল দিল। : ক্যা আমাক খাবা দিলুনা। দেখ দিনি আমার মাংশ খাওয়া আটকাতে পারলু। এখন কেমন হচে।

প্রায়ই খেতে এসে আমার স্ত্রী রওশনের সাথে ও গলপো করতো। একদিন রওশন বলে, আপনি নোংড়া জামা কাপড় পড়ে থাকেন কেন। জামা প্যান্টতো ভালই আছে। সাবান কিনে এগুলো পরিস্কার করে নিবেন। আর কালকে এসে নতুন জামা প্যান্ট নিয়ে যাবেন। গোসল করেন না কেন? আপনি তো পাগল না। কেন পাগলের মত থাকবেন। আপনি ভালো মানুষ। ভালো হয়ে থাকবেন। তাহলে আপনাকে সবাই ভালবাসবে। আর পান কম খাবেন। এত বেশি খেলে দাঁত অপরিস্কার হয়। পরদিন তাকে দেখে রওশনের চক্ষু চরকগাছ। সত্যি সত্যিই মংলু জামা প্যান্ট পরিস্কার করে পড়েছে। গোসলও করেছে। রওশনকে দেখিয়ে বলেছে কেমন হয়েছে। সেদিন সে খায়নি। শুধু জামা কাপড়ই দেখাতেই এসেছিল।

এই ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যেই তার জীবনাবশান হয়। আপসোস মারা যাবার পরও এই সমাজ তাকে এতটুকু সম্মান দেয়নি। সবাই বলেছে মংলু পাগলা মারা গেছে।

আমাদের এই ঘুনেধরা সমাজ আরো অনেকইে পাগল করে রেখেছে, বঞ্চিত রেখেছে। মংলু সমাজকে দেখিয়ে পাগলের মত থাকতো। কিন্তু এমন অনেকে আছেন যারা সমাজের বৈষম্যহীন আচরণে অতিষ্ট হয়েও নিরবে সয়ে যান সারাজীবন। মংলুর মত পাগলামো করে সমাজকে ধিক্কার দিতে পারেননা। ধিক এই সমাজপতিদের। এ সমাজ ভাঙ্গতে হবে। গড়তে হবে সাম্যের সামাজিক আচার।

—কাজী সাঈদ টিটো, ১৮.৯.২০২৩।

আপলোডকারীর তথ্য

সর্বোচ্চ পঠিত

সম্পাদকীয় : মংলু পাগল নয় : অসৎ সমাজপতিদের প্রতি ঘৃনায় পাগল সেজে থাকতো<<মহাদেবপুর দর্পণ>>

প্রকাশের সময় : ০৮:৩৯:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩

মহাদেবপুর দর্পণ : এমন একটা জলজান্ত সুস্থ্য সবল সজ্ঞানে থাকা মানুষকে ওরা পাগল কেন বলতো? কেন তার নামের সাথে পাগলা জুড়ে দিতো? ও কি কোনদিন কখনো কোনরকম পাগলামো করেছে? একটি বার? কাউকে কি কখনো কামড়েছে? মারপিট, ইট ফিকে মারা, অথবা অকথ্য ভাষায় গালাগাল? আপন মনে কখনো কেউ তাকে পাগলের মত বিরবির করতে শুনেছে? তাহলে কোন বৈশিষ্টের কারণে আমাদের আধুনিক সমাজের সম্মানী মানুষেরা কেন পাগল বলে আখ্যায়িত করতো? এইযে একটা মানুষকে সারাজীবন সমাজ অসম্মান করে গেলো, একটা মানুষকে ভাবতে বাধ্য করা হলো যে সমাজ তাকে ছোট ভাবে, ঘৃনা করে এর দায় কার?

মংলুর বয়স হয়েছিল। প্রায়ই অসুস্থ্য থাকতো। তার পোশাক আশাক নোংড়া থাকতো। এর মেলা কারণ আছে। সমাজকে সে প্রচন্ডরকম ঘৃনা করতো। এই সমাজে তার যে একটা অবস্থান আছে এটা সে কখনো ভাবতে পারেনি। সমাজপতিরা তাকে সেটা ভাবার কোন সুযোগ দেয়নি। একজন চেয়ারম্যানের সম্পর্কে সে প্রায়ই খারাপ কথা বলতো। আরো অনেকের দূর্নীতির কথা বলতো। অন্য কাউকে না। দেখা হলে সরাসরি যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকেই বলতো, ‘এই অমুক! তোর এই কাজের তো ব্যবস্থা হচ্ছে রে। আর কতদিন খাবু’।

মহাদেবপুর দর্পণে একবার মংলুর ইন্টারভিউ লাইভ করেছিলাম। দুপুর গড়িয়ে গেছে, খাওয়া হয়নি তখনো। প্রচন্ড ক্ষুধার্ত। কথা বলতে চাচ্ছিলনা। খাওয়ালাম। তারপর শুরু করলাম। জীবনের শেষ বয়সেও কেউ তাকে কোন ভাতার কার্ড করে দেয়নি। সেতো প্রতিবন্ধী ভাতা পাবার হকদার ছিল। এই ভাতা তো একশ ভাগ দেয়া হয়। তাহলে শুধু তার ফরম পূরণ করে দিলেই সে ভাতা পেতো। এই কাজটি গত চার পাঁচ টার্মের কোন চেয়ারম্যান করে দেননি। না বয়স্ক ভাতা, না দশ টাকার চাল, না কোন মওসুমে দশ কেজি, বিশ কেজি চাল, না কোন চিকিৎসা ভাতা, না কোন গরু ছাগল, ভেড়া, মুরগি। কেনো?

লাইভ প্রচারের পরও কেউ এগিয়ে আসেননি তাকে সাহায্য করতে। না প্রশাসন, না জনপ্রতিনিধি, না কোন এনজিও বা ব্যক্তি কেউ। তদানিন্তন চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তিনি তখন বলেছিলেন আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কার্ড করে দিবেন। কিন্তু না।

লাইভ দেখানোর পর থেকে মংলুর সাথে একটু খাতির হয়। দেখা হলে জানতে চাইতাম খাওয়া হয়েছে কিনা। দশ বিশ টাকা দিলেই খুব খুশি হতো। কিন্তু কি আশ্চয্য, অন্য কেউ তাকে টাকা দিতে চাইলেও নেয়না। কোনদিন কারো কাছে সে ভিক্ষেও চায়নি। তার পছন্দের কেউ যদি তাকে কিছু দেয় তবেই সে নিত। একদিন টাকা নেই। বললাম বাসায় চল খাবি। : কি দিয়ে ভাত? : মুরগির মাংশ। : খামু। এরপর যখন বলতাম বাড়ি যা খেয়ে আয়। সে আসতো। আমার বাড়িওয়ালীকে বলতো গিরস্ত পাঠায়ে দিল। ভাল তরকারি হলে খায়। আগে জিজ্ঞাসা করে নেয়। আমার স্ত্রী একদিন আমাকে বললো, আজ মংলু একটা আজব কান্ড করেছে। : কি? মাংশ ভাত হাতে নিয়ে সে কাকে যেন খুব গাল দিল। : ক্যা আমাক খাবা দিলুনা। দেখ দিনি আমার মাংশ খাওয়া আটকাতে পারলু। এখন কেমন হচে।

প্রায়ই খেতে এসে আমার স্ত্রী রওশনের সাথে ও গলপো করতো। একদিন রওশন বলে, আপনি নোংড়া জামা কাপড় পড়ে থাকেন কেন। জামা প্যান্টতো ভালই আছে। সাবান কিনে এগুলো পরিস্কার করে নিবেন। আর কালকে এসে নতুন জামা প্যান্ট নিয়ে যাবেন। গোসল করেন না কেন? আপনি তো পাগল না। কেন পাগলের মত থাকবেন। আপনি ভালো মানুষ। ভালো হয়ে থাকবেন। তাহলে আপনাকে সবাই ভালবাসবে। আর পান কম খাবেন। এত বেশি খেলে দাঁত অপরিস্কার হয়। পরদিন তাকে দেখে রওশনের চক্ষু চরকগাছ। সত্যি সত্যিই মংলু জামা প্যান্ট পরিস্কার করে পড়েছে। গোসলও করেছে। রওশনকে দেখিয়ে বলেছে কেমন হয়েছে। সেদিন সে খায়নি। শুধু জামা কাপড়ই দেখাতেই এসেছিল।

এই ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যেই তার জীবনাবশান হয়। আপসোস মারা যাবার পরও এই সমাজ তাকে এতটুকু সম্মান দেয়নি। সবাই বলেছে মংলু পাগলা মারা গেছে।

আমাদের এই ঘুনেধরা সমাজ আরো অনেকইে পাগল করে রেখেছে, বঞ্চিত রেখেছে। মংলু সমাজকে দেখিয়ে পাগলের মত থাকতো। কিন্তু এমন অনেকে আছেন যারা সমাজের বৈষম্যহীন আচরণে অতিষ্ট হয়েও নিরবে সয়ে যান সারাজীবন। মংলুর মত পাগলামো করে সমাজকে ধিক্কার দিতে পারেননা। ধিক এই সমাজপতিদের। এ সমাজ ভাঙ্গতে হবে। গড়তে হবে সাম্যের সামাজিক আচার।

—কাজী সাঈদ টিটো, ১৮.৯.২০২৩।